করোনা কালীন সময়ে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের জন্য জরুরী উপদেশ- হোসনে আরা বেগম


ঢাকা ভার্সিটির উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী হোসনে আরা বেগম। তিনি মগ বাজার গার্লস হাই স্কুলের প্রাক্তন সিনিয়র বিজ্ঞান শিক্ষিকা । সুদীর্ঘ ৩২ বছর শিক্ষকতা করেছেন এবং সরাসরি  সম্পৃক্ত ছিলেন এনসিটিবি এর পাঠ্যপুস্তক কার্জক্রমের সাথে। আজ তিনি আছেন আমাদের সাথে। আবারো সরকারের জরুরী নির্দেশনায় বন্ধ হলো স্কুল , কলেজ ভার্সিটি। এই সময়ে ছাত্রছাত্রীদের সাথে সাথে অভিভাবকরা ও হয়ে উঠেছেন অস্থির এবং বিষন্ন। কি করতে হবে আমাদের, কি ভাবে আমরা এই সময়টাকে কাজে লাগাতে পারি এবং বিষণ্ণতা দুর করে এই সময়টাকে আনন্দময় ও প্রোডাক্টিভ করে তুলতে পারি সেই পরামর্শই আজ আমরা তাঁর কাছ থেকে নিবো। তাহলে চলুন সরাসরি আলোচনা পর্বে চলে যাওয়া যাক।

সিডনীর ব্লু মাউন্টেনে হোসনে আরা বেগম

প্রশ্নঃ আবার শুরু হলো স্কুল কলেজের প্রতি জরুরী নির্দেশনা। স্কুল কলেজের কার্জক্রম আর সশরীরে কিছু হবে না যা হবে ভার্চুয়ালী।  করোনাকালীন সময়ে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় বাচ্চাদের পডালেখার প্রতি আস্তে আস্তে মনোযোগ কমে আসতে শুরু করে। তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে অভিভাবকরা কি করতে পারে? 

৩২ তম আঞ্চলিক পরিষদ অধিবেশন ২০২১ এ অন্যান্য অতিথিদের সাথে হোসনে আরা বেগম

হো.আ.বে.  করোনাকালীন সময়ে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় বাচ্চাদের মানসিক অবস্থা অন্যান্য সময়ের থেকে পৃথক হয়, তাদের উপরে একটা চাপ সৃষ্টি হয়। তাদের মানসিক বিকাশের জন্য এবংসাথে সাথে পড়ালেখায় মনোযোগ ধরে রাখার জন্য গার্ডিয়ান রা যেসব কাজ করতে পারেন সেই টিপস গুলো দেওয়ার চেস্টা করছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক নিয়মে নামাজ পড়ে বা প্রার্থনা করে নাস্তা খেয়ে যেভাবে স্কুলে যায় সেভাবে তৈরী হয়ে স্কুলের রুটিন অনুযায়ী বইখাতা গুছিয়ে পড়ার টেবিলে বসতে হবে। তারপর স্কুলের পিরিয়ড অনুযায়ী শ্রেনীর কাজ ও বাড়ির কাজ গুলো করতে হবে এবং ঘড়ি সময় অনুযায়ী। মাঝে টিফিন ব্রেক দিতে হবে। টিফিনের পরের ক্লাস গুলি আবার সাজিয়ে দিতে হবে। এতে প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হলেও পড়ে নিয়মটা মেনে চলতে আর অসুবিধা হবে না বরং বাচ্চাদের জন্য বিষয়টা আনন্দদায়ক হবে। যেমন কিছু কিছু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গুলো কিন্তু স্কুলের রুটিন অনুযায়ী অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে, এতে বাচ্চাদের স্কুলের অভ্যাসটা থেকে যাচ্ছে। তারা স্কুলের পরিবেশটাকে অনুভব করতে পারছে।

 

প্রশ্নঃ বাহ! দারুন একটি আইডিয়া দিয়েছেন। আমার মনে হয় এভাবে বাচ্চাদের জন্য একটা খেলা খেলা উৎসবের আমেজও থাকবে আবার স্কুলে যাবার যে অভ্যেসটা সেটাও বহাল থাকবে। আমরা চলে যাচ্ছি  দ্বিতীয় প্রশ্নে। অনেক স্কুল, কলেজেই অনলাইন ক্লাস করার সুযোগ করে দিচ্ছে, আপনার কি মনে হয় এই অনলাইন ক্লাস ম্যানুয়াল ক্লাসের পরিপূরক হতে পারে?

ঢাকা ভার্সিটির সহপাঠিদের সাথে পুনর্মিলনীতে হোসনে আরা বেগম

 হো.আ.বে.   অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গুলো আবার কতগুলো বাংলা মিডিয়াম স্কুলও এই ব্যবস্থা নিয়েছে। ঘরে বসেই তারা স্কুল করতে পারছে আবার পরীক্ষা দিয়েই তারা নতুন ক্লাসে উঠতে পারছে নিজেদের মেধার ভিত্তিতেই। সরকার যদিও অটোপাশ দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাস অবশ্যই ম্যানুয়াল ক্লাসের পরিপূরক হতে পারে। যদিও এই শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দেশের জন্য অনেক ব্যয় সাপেক্ষ,তবুও শিক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা ভালো। শুধু শহরের বাচ্চাদের জন্য অনলাইন ক্লাসের জেরকম সুবিধা ঠিক সেভাবেই গ্রামাঞ্চল, উপজেলা এলাকায় ইন্টারনেট সুবিধা অনেক কম। তেমনি সাড়া দেশের সকল অভিভাবকদের পক্ষে এই অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করে দেওয়া সম্ভব নয়। একদিকে যেমন আর্থিক সুবিধা নেই অন্যদিকে এই ক্লাস নেওয়ার বা করার জন্যও তাদের সেই জ্ঞান বা শিক্ষার প্রয়োজন সেটাও তাদের নেই। সেকারনে প্রজুক্তির সাথে সাথে শিক্ষার প্রসারেরও প্রয়োজন। অভিভাবকদের শিক্ষিত করার জন্য অনেক শিক্ষা ও প্রসিক্ষন দরকার। এবং দরিদ্র শিক্ষার্থিদের আর্থিক অনর্ভুক্তির আওতায় এনে শিক্ষা কর্মসূচি গ্রহন করা যেতে পারে।

 

প্রশ্নঃ আচ্ছা এবার আসছি হবু শিক্ষার্থিদের সমস্যা নিয়ে। যেসব বাচ্চাদের গত বছর স্কুলে যাবার কথা ছিলো কিন্তু তারা এবছরেও স্কুলে যেতে পারছে না এই জরুরী নির্দেশনার জন্য, এর নেতীবাচক প্রভাব এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে কিছু বলুন।

ঢাকা বিজনেস এন্ড প্রফেশনাল উইমেন্স ক্লাবে নারী দিবসে হোসনে আরা বেগম

হো. আঃ. বে. যেসব বাচ্চাদের প্রথম স্কুলে যাবার কথা ছিলো কিন্তু যেতে পারে নাই তারা তো কিছুই বোঝে না, কিন্তু তাদের অভিভাবকরাই অস্থির হয়ে যায়। সেইসব অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই তারা যে মহামারীর দুর্যোগের ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের এটা বুঝতে হবে যে এই রোগটি শুধু বাতাসের মাধ্যমেই ছড়ায় না, এটা মানুষের মাধ্যমে ছড়ায় এমনকি একটা মানুষের পাশ দিয়েও যাওয়া যায় না। কারন এই করোনার জীবানুটি মানুষের নাক, মুখ ও দেহ দিয়েও সংক্রমিত হতে পারে। সেকারনে খুব সাবধানে থাকতে হবে, বাসায় পনেরো মিনিট পর পর হাত ধুতে হবে লাইফবয় সাবান বা হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে। বাসার বাইরে বাচ্চাদের নিয়ে না যাওয়াই ভালো, গেলেও মাস্ক পরতে হবে, মানুষদের থেকে দূরে দূরে থাকতে হবে। বাচ্চাদের বোঝাতে হবে পৃথিবীর সব দেশেই স্কুল কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে, সবাই যেন সুস্থ্য থাকে এজন্য।

 

প্রশ্নঃ করোনাকালীন সময়ে ছাত্রছাত্রীরা এক ধরনের মানসিক চাপে ভোগে, বিষণ্ণ অনুভব করে,এই হতাশা, বিষণ্ণতা দুর করতে টার কি কি ইন্ডোর এক্টিভিটিজ করতে পারে?

ছাত্রীর সাথে হোসনে আরা বেগম

  হো.আ.বে. এই সময় আসলে প্রথম প্রথম কিছুদিন বাবা, মা, ভাই, বোনদের সাথে ভালোই লাগে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্কুলে যেতে হবে না। কিন্তু কয়েকদিন পর থেকে আর ভালো লাগবে না, এক ঘেয়েমি লাগবে। সে কারনে বয়স অনুযায়ী দাবা, লুডু, বাগাডুলি বা ছোট ছোট বল দিয়ে খেলা যেতে পারে। খাতায় লিখে খেলা যেতে পারে, নাম দেশ ফুল ফল, বা কাটাকাটি খেলা। তারপর ছবি আঁকা, খেলনা বানানো, ফুল বানানো, কাগজের তৈরী জিনিস বানাতে শেখা যেতে পারে বা সেলাই শেখা যেতে পারে। এসব ব্যপারে বাবা মা সন্তান্দের মধ্যে প্রতিজোগীতার ব্যবস্থা করে ছোট ছোট পুরুস্কারের ব্যবস্থা করতে পারে, বিশি কিছু না যেমন ছকলেট, ঘড়ি এইসব, বাচ্চারা উপহার পেলেই খুশি হয়। তাদের গল্পের বই পরে শনানো যেতে পারে বা তাদের গল্পের বই পড়তে দেওয়া যেতে পারে, এতে তাদের কল্পনা শক্তি বাড়বে, জ্ঞানের পরিধি বাড়বে। যে বেশী বই পড়বে টার জন্য উপহারের ব্যবস্থা থাকতে পারে। ছোটোরা যে গল্প শুনবে তা খাতায় আঁকার চেস্টা করতে পারে। এভাবে প্রতিটা দিন সুন্দর ও আনন্দপুর্ন হতে পারে বাসার সকল সদস্যদের জন্য। আর টেলিভিশন দেখার জন্য অবশ্যই নির্দিস্ট সময় ঠিক করে দিতে হবে।

 

প্রশ্নঃ আমরা আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু জানলাম এবং সবই যুগ ও সময় উপযোগি। আমি এখন আপনাকে অনুরোধ করবো আপনার জীবনের সাফল্যের গল্প যদি আমাদের পাঠকদের জন্য সংক্ষেপে বলতেন হয়তো তা আমাদের অনেকের জন্যই অনুপ্রেরনার কারন হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল উইমেন্স ডে তে ছাত্রীদের সাথে  র‍্যালীতে হোসনে আরা বেগম

হো.আ.বে. আমার কর্ম জীবনে আমি যা করেছি তাই ধৈর্য্য , অধ্যাবসায় এবং সাফল্যতার সাথেই করেছি আলহামদুলিল্লাহ। আমি শিক্ষকতা করেছি ছাত্র জীবন থেকে। প্রথমে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষকতা করেছি। বি.এড করার সময় একটি স্কুলে ৩০০ জনের মধ্যে আমি প্রধান শিক্ষিকার পদে নিয়োগ পাই, পড়ে অবশ্য আমি সেই স্কুলে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে মগবাজার হাই স্কুলে জয়েন করি। তখন মগবাজার গার্লস হাই স্কুলটি অস্টম শ্রেনী পর্যন্ত ছিলো, এখানে এস.এস.সি পরীক্ষার অনুমোদনের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করি এবং সফল হই। ঢাকা বোর্ডে স্কুলের জন্য এস.এস.সি পরীক্ষার অনুমোদন করা, পরীক্ষার আসন বিন্যাস, ব্যবহারিক পরিক্ষা নেওয়া, পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরী করা, বিজ্ঞান ও জীব বিজ্ঞান বিষয়ে বোর্ডের খাতা দেখা, পরীক্ষক, নিরীক্ষক ও হেড এক্সামিনার হওয়া, এন.সি.টি.বি. তে পাঠ্য পুস্তক লেখা ও মুল্যয়ন করা, বহু ছাত্র ছাত্রীকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষন দেওয়ার চেস্টা করেছি বলে আজ নিজেকে ধন্য মনে হয়। এসময় ছাত্রারী আমাকে ‘’ ফ্রেন্ড টিচার’’ বলে ডাকতো। চাকুরী চলাকালীন সময়ে প্রচুর প্রশিক্ষন নিয়েছি, ৭দিন, ১৫ দিন, ১ মাস এবং ৬ মাস মেয়াদি ছিলো প্রসিক্ষন গুলো করেছি এবং সার্টিফিকেট ও পেয়েছি। অরিয়েন্টেশন পপুলেশন ট্রেনিং, গার্লস গাইড ট্রেনিং, হলদে পাখি ট্রেনিং , কমিশনার ট্রেনিং এবং বিভিন্ন ক্যাম্পিং করেছি। শিক্ষা ব্যবস্থার কারিকুলাম কমিটির মেম্বার ছিলাম। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে সব সময় রচনা প্রতিযোগীতা, কবিতা পাঠ ও কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রধান বিচারক হতাম। শিশু একাডেমির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিচারক হতাম। রেডিও তে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রোগ্রাম করতাম। বিজ্ঞান সিলেবাস এক এক সময় এক এক রকম হওয়ার জন্য প্রশিক্ষক হিসেবে রচনামূলক ও নৈব্যত্তিক প্রশ্নের উপরে গবেষণা করেছি। প্রথম যখন এস.এস.সি পরীক্ষার প্রশ্ন কম্পিঊটারাইজড হয় তখন পুরো ঢাকা শহরে শুধু ১০০ জন শিক্ষককে এই প্রশিক্ষন দেওয়া হয়েছিলো, তারমাঝে আমি ছিলাম। আজ শিক্ষক জীবনের পুরনো কথা বলতে যেয়ে হাজারো স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘ ৩২ বছর শিক্ষকতা করেছি যে মগ বাজার গার্লস হাই স্কুলে সে স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে একটি সায়েন্স ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছি আমি। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে যখন ছাত্রছাত্রীদের অফুরন্ত ভালবাসা পাই তখন মনটা তৃপ্তি তে ভোরে উঠে।

 

আপনার সাথে কথা বলে খুবই ভালো লাগলো। আশা করছি পাঠকরা ও খুব সুন্দর একটি সময় উপভোগ করেছেন আমাদের অতিথি হোসনে আরা বেগমের সাথে। আপনার পরামর্শ এবং সাফল্যের গল্প আশা করছি তরুন ও অভিভাবকদের আশা আলো দেখাবে। আজ এখানেই শেষ করছি রমনীয় পরিবারের সাথে থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন।  


Leave a Reply

Your email address will not be published.